
জমি আইন অনুযায়ী উত্তরাধিকার আইন – বাংলাদেশের সম্পত্তি হস্তান্তরের বিস্তারিত গাইড
বাংলাদেশে উত্তরাধিকার আইন সূত্রে জমি ও সম্পত্তি হস্তান্তরের অনেক নিয়ম ও প্রক্রিয়া বিদ্যমান। পরিবারের সদস্যরা কিভাবে মিলিতভাবে সম্পদ বিতরণ করবেন, ঘুষ বা অবৈধ কার্যক্রম ছাড়া নামজারি কীভাবে করবেন, এই বিষয়গুলো নিয়ে অনেকের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। এই ব্লগে আমরা নিম্নলিখিত বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো:
১. বাংলাদেশে উত্তরাধিকার আইনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ।
২. মুসলিম ও হিন্দু আইনের মধ্যে মূল পার্থক্য।
৩. সম্পত্তি বন্টনের প্রক্রিয়ার ধাপগুলো।
৪. প্রয়োগের ধাপ—দলিল, নামজারি, ও লেনদেন।
৫. আধুনিক পরিবর্তন ও নতুন আইন।
৬. সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)।
Table of Contents
Toggleউত্তরাধিকার আইন কিভাবে কাজ করে?
বাংলাদেশে উত্তরাধিকার এবং সম্পত্তি হস্তান্তর প্রক্রিয়া মূলত দুটি প্রধান আইনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়:
১. The Succession Act, 1925 (Will-based, উইল থাকলে প্রযোজ্য): এই আইন অনুযায়ী, সম্পত্তির ভাগবণ্টন উইল (ইচ্ছাপত্র) থাকা বা না থাকার ওপর নির্ভর করে। উইলবিহীন অবস্থা (intestate) এবং উইলযুক্ত অবস্থা (testate) উভয়ের জন্যই এটি সম্পত্তির আদান-প্রদান সংক্রান্ত বিধান উল্লেখ করে।
২. ধর্মীয় আইনের ভিত্তিতে:
- মুসলিম পার্সোনাল ল’ (Hanafi-based, Shariat Act 1937): মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের জন্য এই আইন অনুসরণ করা হয়, যেখানে পুত্র, কন্যা, স্ত্রী, স্বামী এবং অন্যান্য আত্মীয়রা নির্ধারিত অনুপাতে উত্তরাধিকার লাভ করেন।
- হিন্দু সাকসেশন অ্যাক্ট, ১৯৫৬ (Dayabhaga system): হিন্দু সমাজের সদস্যদের মধ্যে উত্তরাধিকার নির্ধারণের জন্য এই আইন প্রযোজ্য, যেখানে পরিবারগতভাবে সম্পত্তি ভাগাভাগির কিছু পৃথক নিয়ম রয়েছে।
এই দুটি আইনের মধ্যে উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিধানগুলি মুসলিম এবং হিন্দু ধর্ম অনুসারে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের কার্যকর আইন তৈরি করে।

২. মুসলিম বনাম হিন্দু উত্তরাধিকার পদ্ধতি
মুসলিম উত্তরাধিকার (Islamic Shariat):
মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী, স্বামী/স্ত্রী, পুত্র/কন্যা, বাবা-মা, ভাই-বোন ইত্যাদি উত্তরাধিকারী হিসেবে সম্পত্তির ভাগ গ্রহণ করেন। উদাহরণস্বরূপ, পুত্র ও কন্যা থাকলে তারা ২:১ অনুপাতে উত্তরাধিকার লাভ করে, যেখানে স্ত্রী ১/৮ বা ১/৪ অংশ নিতে পারেন।
মৃত মুসলিম ব্যক্তির সম্পত্তি ভাগ করার আগে তার সকল দেনা ও খরচ পরিশোধ করা আবশ্যক। পরবর্তী সময়ে অবশিষ্ট সম্পত্তি শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী বণ্টন করা হয়।
হিন্দু উত্তরাধিকার (Dayabhaga):
হিন্দু উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় বৃহত্তর পরিবার যেমন পুত্র, পুত্রপুত্র, পুত্রবধূ এবং পিতামাতা ইত্যাদি এটি ভোগ করেন। ঐতিহ্যগতভাবে, হিন্দু আইনে মেয়েরা সাধারণত উত্তরাধিকার লাভের অধিকারী ছিলেন না। তবে, সাম্প্রতিক সময়ে আইনি পরিবর্তনের মাধ্যমে মেয়েরা এখনো উত্তরাধিকার পাওয়ার ক্ষমতা অর্জন করেছে।
৩. জমি উত্তরাধিকার প্রক্রিয়া—ধাপগুলো বিশ্লেষণ
৩.১ উইল/ইনটেস্টেট নির্ধারণ
যদি আপনাদের কাছে একটি উইল থাকে, তাহলে Succession Act অনুযায়ী সম্পত্তি বণ্টিত হবে। কিন্তু যদি উইল না থাকে, তাহলে ধর্মীয় উত্তরাধিকার আইন অনুসরণ করা হবে।
৩.২ আপোষ-বণ্টননামা দলিল
২০২৫ সালে প্রকাশিত নতুন নিয়ম অনুসারে, যদি আপোষ-বণ্টননামা উপস্থিত না থাকে, তাহলে নামজারি কিংবা বিক্রয় নিষিদ্ধ হবে। এই দলিলে পরিবারের সকল সদস্যের সম্মতি এবং স্বাক্ষর থাকা অপরিহার্য।
৩.৩ বিরোধ-মুক্ত মামলা হ্রাস
যখন দলিল অনুপস্থিত থাকে, তখন পারিবারিক বিরোধ এবং মামলা জারি হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যেতে পারে। তবে, যদি নামজারি এবং দলিলায়ন সম্পন্ন থাকে, তাহলে আদালতের মামলা ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে সম্পত্তি হস্তান্তর সম্ভব।
৩.৪ প্রামাণিক কাগজপত্র সংগ্রহ
উত্তরাধিকারীদের জাতীয় পরিচয়পত্র, নিবন্ধন সার্টিফিকেট ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সংগ্রহ করা প্রয়োজন।
৪. দলিল ও নামজারি—নিশ্চিত সম্পত্তির জন্য পদক্ষেপ
আপোষ-বণ্টননামা প্রস্তুত করুন: সবশেষ তথ্য নিশ্চিত করে স্বাক্ষর করুন।
রেজিস্ট্রেশন অফিসে দলিল জমা দিন: ‘পরচা’, ‘নামজারি’, ‘টাইটেল ডিড’ মিউটেশনের মাধ্যমে নাম অন্তর্ভুক্ত করুন।
সরকারি খাজনা ও ফি: অনলাইন বা ব্যাংক চালানের মাধ্যমে ফি পরিশোধ করুন।
-এ ট্র্যাকিং এবং স্ট্যাটাস আপডেট: জমির অবস্থা সঠিকভাবে নজরদারি করতে সক্ষম হবেন।
নামজারি ছাড়া জমি বিক্রি আইনগতভাবে সম্ভব নয়। সরকারি রেকর্ডে নাম অন্তর্ভুক্ত না থাকলে জমির মালিকানা প্রমাণে সমস্যা হতে পারে।
৫. আধুনিক পরিবর্তন এবং আইন সংস্কার ২০২৫
পূর্বে উল্লেখিত আপোষ-বণ্টননামাকে সর্বাধিক কার্যকর এবং বাধ্যতামূলক হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
দেশের প্রায় সব ভূমি অফিস এখন ডিজিটাল পদ্ধতির মাধ্যমে কাজ করছে, যার ফলে ভার্চুয়াল রেকর্ডিং এবং ই-ট্র্যাকিং ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে কার্যকর হয়েছে।
e-mutation আবেদনের মাধ্যমেই সাধারণ মানুষ সহজে জমি সংক্রান্ত তথ্য যেমন e-khatian যাচাই এবং অনলাইন জমি পর্চার যাচাই করতে পারছেন।
বিধিবদ্ধ শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ বিধি ২০২৩ অনুসারে, যদি আইনকে যথাযথভাবে অনুসরণ করা না হয়।
৬. FAQ — সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর
জমি উত্তরাধিকার নিবন্ধনের প্রথম ধাপ কী?
আপোষ-বণ্টননামা দলিল তৈরি করে তা রেজিস্ট্রি করা।
উইল থাকা কি বাধ্যতামূলক?
উইল না থাকলেও ধর্মীয় আইন অনুযায়ী সম্পত্তির বণ্টন হবে, তবে একটি আপোষ-বণ্টননামা থাকা আইনগতভাবে সম্মানিত বলে গন্য হবে।
স্বামী বা স্ত্রী কতটা অংশ পায়?
স্ত্রী: ১/৮ (যদি পুত্র ও পুত্রপুত্র থাকে), অন্যথায় ১/৪। স্বামী: উত্তরাধিকারী কারা আছে তার উপর ভিত্তি করে ১/৪ থেকে ১/২।
পুত্র ও কন্যার সম্পত্তির অধিকার কেমন?
পুত্র এবং কন্যার মধ্যে ২:১ অনুপাতে ভাগ হয়; অর্থাৎ ২ অংশ পুত্রের জন্য এবং ১ অংশ কন্যার জন্য। তবে ইসলামী শরিয়তের বাইরে আদালতের মাধ্যমে সমতা আনা সম্ভব।
নামজারি সম্পন্ন হতে কতদিন লাগে?
সকল দলিল ও নথি সঠিক থাকলে সাধারণত ৩০ দিন লাগতে পারে।
৭. নিউ গিনি প্রপার্টিজের নির্দেশনা
যদি আপনি উত্তরাধিকার সূত্রে জমি পান, তাহলে অবশ্যই নিচের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে:
• আপোষ-বণ্টননামার দলিল তৈরি করে রেজিস্ট্রি করান।
• অনলাইনে নামজারির অবস্থান নিশ্চিত করুন।
• সরকারের ওয়েবসাইট ব্যবহার করলে অস্বচ্ছতা এড়িয়ে চলা সহজ হবে।
উত্তরাধিকার আইন ও নিউ গিনি প্রপার্টিজের পরামর্শ
আপনার উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমি সঠিকভাবে স্থানান্তর করতে এবং পারিবারিক মামলা-মোকদ্দমা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য একজন অভিজ্ঞ ভূমি পরামর্শকের সাহায্য নেয়া অত্যন্ত জরুরি।
নিউ গিনি প্রপার্টিজ লিমিটেড আপনার পরিবারের জমির বিষয়গুলো সঠিকভাবে নিয়মিত ও নিরাপদভাবে পরিচালনা করতে সর্বদাই সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। আমরা দলিল, নামজারি, খতিয়ান যাচাই ও জমি কেনাবেচায় নিপুণ আমাদের সেবা প্রদান করি।